স্টাফ রিপোর্টার: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা খন্দকার আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি জেলা পর্যায়ে ১২টি হাইটেক পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক–এর আস্থাভাজন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন খন্দকার আশরাফুল আলম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবেও পরিচিত। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ এবং প্রকল্পে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হয়েও প্রেষণে থাকা অবস্থায় স্বল্প সময়ে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর গ্রীন রোডের গ্রীনপিস ভবনের ২৮/১ নম্বরে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া সম্প্রতি পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় আরও একটি প্লট কেনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শুধু রাজধানীতেই নয়, নিজ জেলা নড়াইলেও তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালি, আলাদাতপুর ও নিশিনাথতলা এলাকায় তার একাধিক মূল্যবান প্লট ও জমি রয়েছে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। প্রকল্পের সহকারী পরিচালক হিসেবে ব্যবহৃত সরকারি গাড়িটি এলপিজি গ্যাসে চালিত হলেও তিনি নিয়মিত অকটেন ব্যবহারের ভুয়া বিল জমা দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা গেছে, সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত চালক থাকা সত্ত্বেও তিনি অফিসের পিয়ন ফজলুল করিমকে দিয়ে গাড়ি চালান। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তার ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই তৃতীয় শ্রেণির ওই কর্মচারীকে চালক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপকর্মের তথ্য বাইরে না যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাইটেক পার্ক প্রকল্পের এক কর্মকর্তা বলেন, “পতিত সরকারের মন্ত্রী পলকের আস্থাভাজন হয়ে তিনি এই প্রকল্পে আসেন। পরে পুরো হাইটেক প্রকল্পকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া, কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং কমিশন বাণিজ্যের কারণে প্রকল্পের কাজের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, “দুদক যদি সঠিকভাবে তদন্ত করে, তাহলে আশরাফুল আলমের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র দেশবাসীর সামনে উঠে আসবে।”
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে খন্দকার আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারহানা রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকে একটি তদন্ত শুরু হয়েছিল। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেই তদন্ত অগ্রসর হতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেলে আশরাফুল আলম আরও কৌশলী হয়ে ওঠেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রীর নামে পোস্ট অফিসে জমাকৃত কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করে তা নিজের দুই ভাগিনার নামে সরিয়ে রেখেছেন তিনি, যাতে সম্পদের উৎস গোপন রাখা যায়।
এছাড়া হাইটেক পার্ক প্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে দামি আইফোনসহ বিভিন্ন উপহার গ্রহণের তথ্যও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বর্তমানে তিনি পুনরায় শিক্ষা ক্যাডারে ফিরে যাওয়ার তদবির চালাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খন্দকার আশরাফুল আলম বলেন, প্রায় ২০ বছরের চাকরিজীবনের বৈধ আয় থেকেই তিনি এসব সম্পদ গড়েছেন। গ্রীন রোডের ফ্ল্যাটটি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে কেনা হয়েছে এবং ঋণও পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করলেও তিনি এ সংক্রান্ত কোনো নথি বা প্রমাণপত্র দেখাতে পারেননি।
পূর্বাচলের প্লট ও নড়াইলের অন্যান্য সম্পদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি দাবি করেন, পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধের জেরে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
একপর্যায়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রতিবেদকের কাছে অনুরোধ জানান এই কর্মকর্তা। একইসঙ্গে তার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত উল্লেখ করে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখার আহ্বানও জানান তিনি।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার বৈধ আয়ে অল্প সময়ে ঢাকা ও নড়াইলে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কতটা সম্ভব? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আশরাফুলের সম্পদের বিবরণ নিয়ে বিস্তারিত আসছে অনুসন্ধানের ২য় পর্বে…..
Array
